স্বাধীনবাংলা, কক্সবাজার স্বাধীনবাংলা, কক্সবাজার

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ০১:৩৭ পিএম

অনলাইন সংস্করণ

#

বহুতল ভবনের আড়ালে কক্সবাজারের সাগর, পর্যটনে বাড়ছে হতাশা

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন লাখো পর্যটক। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সৈকতসংলগ্ন বহুতল ভবন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও বিনোদনের সীমিত সুযোগে পর্যটন শহরটির আকর্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষ করে কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সৈকতের আশপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য উঁচু ভবনের কারণে অনেক জায়গা থেকে সরাসরি সাগর দেখা যায় না। পর্যটকদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বদলে চোখে পড়ে হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা।

সপরিবারে কক্সবাজারে আসা এক পর্যটক বলেন, একসময় কক্সবাজারে এসে যে নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ পাওয়া যেত, এখন তার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। সৈকতের কিছু এলাকায় ময়লা-আবর্জনা ও ভাঙাচোরা পরিবেশও পর্যটকদের হতাশ করছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সৈকতসংলগ্ন প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় গত তিন দশকে ৭০০টির বেশি বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে। এসব ভবনের মধ্যে শত শত আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস রয়েছে। অনেক ভবনের উচ্চতা চার থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত।

অভিযোগ রয়েছে, এসব স্থাপনার বড় একটি অংশের পরিবেশগত অনুমোদন নেই। প্রায় ৭০০ ভবনের মধ্যে মাত্র ১৪টি তারকা মানের প্রতিষ্ঠানে সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা এসটিপি রয়েছে। পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৪৫টির।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পাশাপাশি এসটিপি ও পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া হোটেল-রিসোর্ট পরিচালনা না করার জন্য দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় হোটেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য সাগরে গিয়ে পড়ছে। এতে সামুদ্রিক পরিবেশ ও সৈকতের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন এলাকায়ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে ঝাউবাগান, লাল কাঁকড়া ও সামুদ্রিক কাছিমের প্রজনন পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও বিনোদনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। পর্যটকদের মতে, দিনে সৈকত, পাহাড় ও ঝরনা ঘুরে সময় কাটানো গেলেও রাতে পরিবারের সদস্য ও শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। আধুনিক বিনোদনকেন্দ্র, পার্ক ও অন্যান্য পর্যটন সুবিধা বাড়ানোর দাবি রয়েছে।

সাগরে গোসলের নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের বিষয়। কলাতলী থেকে লাবণী পর্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকায় লাইফগার্ড থাকলেও টেকনাফ পর্যন্ত দীর্ঘ সৈকতের অনেক অংশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকর্মী নেই। গুপ্তখাল ও শক্তিশালী স্রোতের কারণে প্রতিবছর দুর্ঘটনাও ঘটে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উদ্ধার তৎপরতায় আধুনিক জলযান, ড্রোন ও প্রশিক্ষিত ডুবুরি দলের ঘাটতি রয়েছে। পুরো সৈকতজুড়ে জরুরি চিকিৎসাসেবাও আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

এদিকে বিদেশি পর্যটকের উপস্থিতিও আগের তুলনায় কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তাঁদের মতে, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা, রাত্রিকালীন বিনোদন, আন্তর্জাতিক মানের সেবা ও পর্যটন অবকাঠামো উন্নত করা গেলে কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণের সুযোগ বাড়বে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, কক্সবাজারকে শুধু হোটেলনির্ভর পর্যটনকেন্দ্র না বানিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি সৈকতের বিভিন্ন অংশে আলাদা বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে পর্যটকের চাপও কমানো সম্ভব।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর থাকার কথা জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে পরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও বহুমুখী বিনোদনব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

 

স্বাধীনবাংলা.নেট